সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কুফর শিরক ও বেদআত নির্মূলে ওলামায়ে দেওবন্দের ভূমিকা

প্রতিটি মুমিনের জীবনের অমূল্য সম্পদ ঈমান ৷ আত্মাহীন দেহ যেমন লাশ ৷ তেমনি ঈমানহীন জীবনও অভিশাপ ৷ তাই বৈষয়িক সম্পদকে যতটুকো গুরূত্বের সাথে হেফাজত করতে হয়, তার চেয়ে অধিক সতর্ক থাকতে হয়  দুজাহানের মূলধন ঈমানের ব্যপারে ৷ 
প্রতিটি মূল্যবান জিনিসেই থাকে বেশ কিছু ভয়ের দিক ৷ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় ৷ হারিয়ে যাওয়ার ভয় ৷ চোর ডাকাতের ভয় ৷ বস্তুর গুরূত্ব ও মূল্যের ভিত্তিতে তার নিরাপত্তা বিষয়ক প্রস্তুতি নেয়া হয় ৷ যে জিনিস নষ্ট হলে মালিকের ক্ষতির পরিমান বেশী হয় তার জন্য ততোবেশী মনোযোগ নিবিষ্ট করতে হয় ৷ মেহনত মুজাহাদা করতে হয় ৷ অর্থকড়ি খরচ করতে হয় ৷ প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হয় ! 

ঈমান এমনই একটি বিষয়, যার শুদ্ধতার সাথে সকল আমলের শুভ্রতা জড়ানো ৷ যার পরিচয়ের সাথে শেকড়ের হাজারো গল্প ছড়ানো ৷ যার পূর্ণতার সাথে দুনিয়া আখেরাতের সকল সফলতা মোড়ানো ৷ তাই এই অমূল্য সম্পদ কে রক্ষা করার জন্য যুগে যুগে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে! ভয় শঙ্কার বিষয়গুলো কে দূরে রাখা হয়েছে ৷ চোর ডাকাতের হামলা থেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে! বিধ্বংসী শত্রুর খপ্পর থেকে মুক্ত রাখার প্রয়াস চালানো হয়েছে ৷

মুহাম্মাদে আরাবির আনিত, অকাট্যভাবে প্রমানিত বিষয়াবলীর প্রতি মনের গভীর ও নিবির সূক্ষ্ম ভগ্নহীন বিশ্বাসের নাম  ঈমান ৷ এটা শুরু ও শেষের বিন্দু ৷ অস্তিত্বের কেন্দ্র! তারপর মৌখিক স্বীকৃতি ও দেহের আমলের বাহনে চড়ে আলোয় সৌরভে, ফুলে ফলে পরিপক্কতা ও পরিপূর্ণতার রাজপথে চলতে থাকে ঈমান ৷ কিন্তু এপথ খুবই কণ্টকাকীর্ণ ৷ বিপদসঙ্কুল ৷ এপথের ম্যাপ বুঝতে হয় ৷ শত্রু মিত্র চিনতে হয় ৷ আত্মরক্ষা শিখতে হয় ৷ নইলে ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে ৷ আলোহীন হয়ে পড়ে ৷ সব সৌকর্য হারিয়ে ফেলে ৷ ঈমানের ঘর ভেঙ্গে যায় ৷ আলোর সূর্য কালো হয়ে যায় ৷ 

তাই সাধারনত বিজ্ঞজন বস্তুর বিপরীত বিষয়গুলোকে আগে জেনে নেয় ৷ সাংঘর্ষিক প্রসঙ্গগুলো বুঝে নেয় ৷ বিনাশী ও বিধ্বংসী জিনিসগুলো আলাদা করে দেয় ৷ তাই আমরাও সঠিক ঈমানকে অর্জন ও সংরক্ষণের জন্য সাংঘর্ষিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো ৷ তারপর এসব বিপদসঙ্কুল বিষয় থেকে ঈমানকে নিরাপদ রাখার জন্য আলেমদের যুগ যুগ ধরে গৃহীত ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করবো ৷ পরিশেষে ঈমানের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ও রূপরেখা উপস্থাপন করে আলোচনা শেষ করবো ইনশাআল্লাহ!

শান্তিপূর্ণ এই পৃথিবীকে কুফর ও শিরক বার বার অশান্ত করেছে ৷ মানুষ ও সমাজের অপূরনীয় ক্ষতি সাধন করেছে ৷ আশীর্বাদকে অভিশাপে পরিণত করেছে ৷ ঈমানের কাঙ্ক্ষিত বলয় ও জগৎ কে প্রকম্পিত করেছে ৷ সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার মধুর ও গভীর সম্পর্ককে ভেঙ্গে চৌচির করে দিয়েছে ৷ হাতে বানানো পুতুল কে মহান মানুষের প্রভু বানিয়ে মানবতাকে অপমান করেছে ৷ পরাক্রমশালী মালিকের সাথে অসম অংশীদার স্থাপন করে অস্পৃশ্য একক প্রভুত্বকে অপরিণামদর্শী হাস্যকর  আঘাত করেছে ৷ 
তাই প্রতিটি ঈমানদারকে কুফর ও শিরকের পরিচয় প্রকার ও প্রভাবের ব্যাপারে অবগত থাকতে হবে ৷ নিজের ঈমান ও জীবন কে নিরাপদ রাখার জন্য ৷ 

কুফর এর পরিচয়: রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যেসকল বিধি-বিধান লাভ করেছেন এবং অকাট্য দলীল দ্বারা তা প্রমাণিত হয়েছে সেসকল বিষয় কে বা কোন একটি কে অস্বীকার করা বা এমন কোন বিষয়ে মনে সন্দেহ পোষণ করা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কিংবা উপহাস-বিদ্রুপ করা ই কুফরী ৷ এমন স্পষ্ট কুফরীর মাধ্যমে মুমিনের ঈমান নষ্ট হয়ে যায় ৷ অতীত জীবনের সমস্ত আমল বাতিল হয়ে যায় ৷ বিবাহিত হলে বিয়ে ভেঙ্গে যায় ৷ 
তাই ইচ্ছায় অনিচ্ছায় এমন কোন কুফরী কাজ হয়ে গেলে আবারো কালিমা পড়ে বিবাহকে নবায়ন করে নিতে হবে ৷ 

কুফর এর প্রকারভেদ: কুফরের নানান প্রকার রয়েছে ৷ ঈমান কে ঠিক রাখতে হলে সবরকম কুফরী থেকেই বেঁচে থাকতে হবে ৷
১.কুফরে ইনকার:  মন ও যবান উভয়ভাবেই অকাট্যভাবে প্রমাণিত দীনি বিষয়সমূহ কে অস্বীকার করা ৷ যেমন, মক্কার কাফের ও বর্তমান পৃথিবীর বিধর্মীগণ ৷
২.কুফরে জুহুদ: মনে বিশ্বাস রাখা কিন্তু মুখে অস্বীকার করা ৷ যেমন, মদীনার ইয়াহুদীগণ ৷
৩.কুফরে ইনাদ: মনে দীনের বিশ্বাস আছে মুখেও বাহ্যত স্বীকার করে কিন্তু ইসলামের হুকুম আহকামকে মান্য করে না ৷ অন্যান্য দীন বাতিল হয়ে গেছে তাও বিশ্বাস করে না ৷ যেমন, আদমশুমারীর অনেক নামধারী মুসলমান যারা কখনো সঠিক দীনি পরিবেশে আসে না ৷ 

৪.কুফরে যানাদাকাহ: বাহ্যিকভাবে দীনের সব কিছু স্বীকার করে, কোন বিষয় কে অস্বীকার করে না কিন্তু দীনের কোন বিষয়ে এমন ব্যাখ্যা প্রদান করে যা-
উম্মতের ইজমা পরিপন্থী যেমন, কাদিয়ানীগণ খতমে নবুওয়াতের ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করে তাদের ভণ্ড নবী কে প্রমাণ করে ৷ 

উল্লিখিত প্রকারের যে কোন একটি কুফর পাওয়া গেলে তার ঈমান চলে যাবে ৷

(মুফতী মনসূরুল হক কৃত কিতাবুল ঈমান;পৃষ্ঠা,৯-১০)

কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে কুফর:

সুখময় সফল জীবনের জন্য ঈমানী জীবনকেই গ্রহণ করতে হবে ৷ তার পরিবর্তে কুফর গ্রহণ করলে দুনিয়া ও আখেরাতে অপেক্ষা করবে ভয়াবহ পরিণতি ৷ ভাগ্যাহত হয়ে শুধু ধ্বংসের পথেই হারাতে হবে ৷ এরশাদে বারী তায়ালা:
وَ مَنۡ یَّتَبَدَّلِ الۡکُفۡرَ بِالۡاِیۡمَانِ فَقَدۡ ضَلَّ سَوَآءَ  السَّبِیۡلِ ﴿۱۰۸﴾

অর্থঃ যে কেউ ঈমানের পরিবর্তে কুফর গ্রহণ করে, সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায় ৷
    (সূরা বাকারা (البقرة), আয়াত: ১০৮)

অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে: 
اِنَّ الَّذِیۡنَ اشۡتَرَوُا الۡکُفۡرَ بِالۡاِیۡمَانِ لَنۡ یَّضُرُّوا اللّٰہَ شَیۡئًا ۚ وَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ﴿۱۷۷﴾ 

অর্থঃ যারা ঈমানের পরিবর্তে কুফর ক্রয় করে নিয়েছে, তারা আল্লাহ তা’আলার কিছুই ক্ষতিসাধন করতে পারবে না। আর তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি।

(সূরা আল ইমরান (آل عمران), আয়াত: ১৭৭)

মুমিনের সবচেয়ে গুরূত্বপূর্ণ পরিচয়, আত্মীয়তা ও বন্ধন হলো ঈমানী আত্মীয়তা ও বন্ধন ৷ তাই সব সম্পর্কের মাপকাঠি ও মূল্যায়ন এর ভিত্তিতেই হয়ে থাকে ৷ অচেনা ভিনদেশী অন্যভাষী একজন মানুষ পরম আপন হয়ে যায় ঈমানী ভ্রাতৃত্বের সূদৃঢ় সূত্রে ৷ আবার একজন রক্তের আত্মীয়, বংশের মানুষ এমনকি মা-বাবা সন্তানের পরিচয়ও ম্লান ও পরিত্যাক্ত হয়ে যায় কুফরের অভিশাপের কারণে ৷ ফরমানে বারি তায়ালা: 
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَتَّخِذُوۡۤا اٰبَآءَکُمۡ وَ اِخۡوَانَکُمۡ اَوۡلِیَآءَ اِنِ اسۡتَحَبُّوا الۡکُفۡرَ عَلَی الۡاِیۡمَانِ ؕ وَ مَنۡ یَّتَوَلَّہُمۡ مِّنۡکُمۡ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ ﴿۲۳﴾ 

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা সীমালংঘনকারী।
(সূরা আত-তাওবাহ্‌ (التوبة), আয়াত: ২৩)

শিরকের পরিচয় ও প্রকার:

আল্লাহ তায়ালার খোদায়ী তথা শাসন ক্ষমতা ও কতৃত্বে অথবা অন্য কোন গুণাবলীর ক্ষেত্রে কাউকে তার শরীক তথা অংশীদার সমকক্ষ বা সহযোগী মনে করাই শিরক ৷ 

শাহ আব্দুল কাদের মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. এর ভাষায় -আল্লাহ তায়ালার বিশেষ কোন গুণকে অন্যের সাথে সম্পৃক্ত করা ৷ যেমন, কারো ব্যাপারে এই বিশ্বাস রাখা যে, আমাদের জানা অজানা সমস্ত গায়েবের ব্যাপারে সে অবগত, অথবা সে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, অথবা আমাদের ভালো-মন্দের সমস্ত বিষয় তার নিয়ন্ত্রনাধীন ইত্যাদি ৷

শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. তৎকালীন আরব মুশরিকদের শিরকী আকীদা-বিশ্বাস ও ধ্যান ধারণার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেন: আরবের মুশরিকরা রোগমুক্তি অভাব মোচনসহ নানান প্রয়োজনে গায়রুল্লাহর সাহায্য কামনা করে তাদের নামে মান্নত মানতো, যেন উদ্দেশ্য সফল হয় এবং বরকতের জন্য তারা গায়রুল্লাহর নামের তাসবীহ জপতো- যেগুলো সুস্পষ্ট শিরিক ৷ 
তাই তাদের এই শিরকী চিন্তার মূলোৎপাটনের জন্য নামাযে আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত পড়ার আদেশ জারী করলেন ৷ إياك نعبد وإياك نستعين আমরা আপনারই এবাদত-বন্দেগী করি এবং আপনার কাছেই সাহায্য চাই ৷ অন্যত্র এরশাদ করলেন: فلا تدعوا مع الله أحدا তোমরা আল্লাহ তায়ালার সাথে অন্য কাউকে ডেকোনা ৷
  -হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা,১ম খণ্ড,পৃষ্ঠা:৬২

শিরক এমন এক অভিশাপ যার কারণে শুধু শিরকে লিপ্ত ব্যক্তির আমলই বরবাদ হয় না বরং অন্য কোন একত্ববাদে বিশ্বাসী আল্লাহর কোন খাছ বান্দাও যদি দোয়া করে তাও আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না! 
শিরকের গুনাহ মৃত্যুপূর্ব তওবা ব্যাতিত মাফ হয় না ৷ কেয়ামতের দিনও মাফ হবে না ৷ শিরকের কারণে যেভাবে ঈমান চলে যায় তেমনই বিবাহিত হলে বৈবাহিক সম্পর্কও শেষ হয়ে যায় ৷ তাই কারো দ্বারা এই জঘন্য শিরকী পাপ হয়ে গেলে জরুরী হলো খাটি দিলে একনিষ্ঠভাবে তওবা করে কালিমা পড়ে ঈমানকে নবায়ন করার পাশাপাশী বিবাহকেও নবায়ন করা!
আল্লাহ বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ শিরক ক্ষমা করেন না, এছাড়া অন্য যে কোন পাপ আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করতে পারেন ৷
        - সূরা নিসা: আয়াত: ১১৬
অন্য আয়াতে বলেন:  যদি তুমি শিরক কর তাহলে তোমার সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে যাবে ৷  -সূরা যুমার: আয়াত ৬৫

সূরা তাওবা তে বলেন:  মুশরিকরা নাপাক ৷ 
এই নাপাকি ও অপবিত্রতা সমাজকে কলুষিত করে ৷ মানুষ ও সভ্যতাকেও কলঙ্কিত করে ৷ ধ্বংস করে ধর্মচর্চার পবিত্র সুরভিত পথকে ৷ তাই শিরকের সকল প্রকারসহ পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি প্রতিটি সচেতন মুসলমানের জানা থাকা প্রয়োজন ৷

শিরকের প্রকারভেদ:

১.শিরক ফিয-যাত বা আল্লাহর অস্তিত্বে শিরক 
 
আল্লাহ তায়ালার সত্তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার বানানো ৷ যেমন, দুই বা তিন খোদা মানা ৷ ইরশাদ হয়েছে: وإذ قال لقمان لابنه وهو يعظه يا بني لا تشرك بالله إن الشرك لظلم عظيم 
যখন লোকমান উপদেশরূপে তার পুত্রকে বললো: হে বৎস! আল্লাহর সাথে শরীক করো না ৷ নিশ্চয়ই আল্লাহর সাথে শরীক করা মহা অন্যায় ৷ 
              -সূরা লোকমান,আয়াত ১৩
জুলুমের হাকীকত বর্ণনা করকে গিয়ে ওলামায়ে কেরাম লিখেন, কোন বস্তুকে অপাত্রে রাখাই হলো জুলুম তথা অবিচার ৷ এখানে তাই শিরক জুলুম হওয়টা অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ৷ যেহেতু স্রষ্টার পরিবর্তে সৃষ্টির বা সৃষ্টির হাতে গড়া মূর্তির পূঁজা করা হয়, কিংবা তার সত্বায় অন্য কাউকে শরীক করা হয় ৷ সুতরাং প্রভুত্বের এই স্বেচ্ছাচারী ও বিদ্রুপাত্বক নিসবত ও শিরকত অপাত্রের ঘৃণ্য জুলুম ৷
যেমন, খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম কে এবং ইহুদিরা হযরত উযাইর আলাইহিস সালাম কে হিন্দুরা হাতে বানানো মূর্তিকে আল্লাহ তায়ালার শরীক তথা সমকক্ষ মনে করে!

২.শিরক ফিস সিফাত তথা গুণাবলীর ক্ষেত্রে শিরক
আল্লাহ তায়ালার গুণাবলীর ক্ষেত্রে শরীক করার অনেক প্রকার রয়েছে,এর মধ্যে প্রসিদ্ধ প্রকারগুলো হলো:
ক. শিরক ফিল ইলম বা অদৃশ্যের জ্ঞানে শিরক
অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন নবী ওলী পীর বুজুর্গ অদ়শ্যের জ্ঞান রাখেন বা গায়েবের খবর জানেন বা মানুষের ভালো মন্দের ব্যাপারে অবগত আছেন এমন বিশ্বাস করা ৷ এসবই শিরক ফিল ইলম তথা অন্য কারো জ্ঞান কে আল্লাহ তায়ালার জ্ঞানের সমকক্ষ মনে করা ৷

আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وعنده مفاتيح الغيب لا يعلمها إلا هو
অর্থ: গায়েবের চাবিকাঠি তাঁরই হাতে ৷ তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানেনা!
                -সূরা আনআম, আয়াত; ৫৯
( সুতরাং নবী, ওলী গাউস কুতুব জ্যোতিষী, গণক কেউ গায়েব জানেন, এমন মনে করা শিরক)

খ.শিরক ফিত তাসাররুফ তথা কতৃত্বের ক্ষেত্রে শিরক
অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি,ক্ষমতা-প্রতিপত্মী ইত্যাদি চাওয়া ৷
ইরশাদ হয়েছে:
           
قُلۡ مَنۡۢ بِیَدِہٖ مَلَکُوۡتُ کُلِّ شَیۡءٍ وَّ ہُوَ یُجِیۡرُ وَ لَا یُجَارُ عَلَیۡہِ  اِنۡ کُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ (۸۸)

অর্থঃ বলুনঃ তোমাদের জানা থাকলে বল, কার হাতে সব বস্তুর কতৃত্ব, যিনি রক্ষা করেন এবং যার কবল থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না ?
-সূরা আল মু'মিনূন (المؤمنون), আয়াত: ৮৮
গ.শিরক ফিস সামা' ওয়াল বাছার তথা সর্বশ্রবণ ও দর্শনের ক্ষেত্রে শিরক

অর্থাৎ কোন ব্যক্তি বা সৃষ্টির ব্যাপারে এই ধারণা করা যে, তিনি কাছের দূরের সব শব্দ ও দৃশ্য কে আল্লাহর মতোই শুনেন ও দেখেন ৷ তিনি আমাদের সব বিষয়ের সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশ্রোতা ৷ এটা শিরক ফিস সামা'ওয়াল বাছার ৷

আল্লাহ তায়ালা বলেন: 
اِنَّ  اللّٰہَ  هوَ  السَّمِیۡعُ  الۡبَصِیۡرُ ﴿٪۲۰﴾ 
অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন, সবকিছু দেখেন।
    -সূরা আল মু'মিন (غافر), আয়াত: ২০

ঘ. শিরক ফিল হুকুম তথা বিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে শিরক

অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার ন্যায় অন্য কাউকে হাকেম তথা হুকুমকর্তা মেনে নিয়ে তার হুকুমকে আল্লাহ তায়ালার হুকুমের সমকক্ষ মনে করা ৷ কিংবা আল্লাহ তায়ালার বিধানের উপর মানব রচিত অন্য কোন বিধানকে প্রাধান্য দেয়া ৷ এসবই শিরক ফিল হুকুম ৷
ইরশাদ হয়েছে:
 إن الحكم إلا لله
অর্থ: বিধান দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ৷
     - সূরা ইউসুফ; আয়াত,৪০
ঙ.শিরক ফিল এবাদাত তথা এবাদত-বন্দেগীর ক্ষেত্রে শিরক

অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার ন্যায় অন্য কাউকে মাবুদ বা উপাস্য-পূজ্য মনে করা ৷ কিংবা এবাদত সদৃশ কোন কাজ কোন মাখলুকের জন্য নিবেদন করা ৷ যেমন, কোন পীর অথবা কবরকে সিজদা করা ৷ কোন নবী ওলী বা পীরের নামে রোজা রাখা ৷ গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে মান্নত মানা ৷ কোন ঘর বা মাজারকে কেন্দ্র করে তার চারদিকে কাবা শরীফের ন্যায় তাওয়াফ করা ৷ গায়রুল্লাহর নামে ষাঁড়, মহিশ, মোরগ ইত্যাদি ছেড়ে দেওয়া বা বলি দেওয়া ৷ কারো নামে বকরী জবাই করা ইত্যাদী সবই শিরক ফিল এবাদাত ৷
(মুফতি আব্দুশ শাকুর কাসেমীকৃত কুফরিয়া আলফাজ আওর উনকি আহকামাত ৷)

বিদআতের পরিচয় ও পরিণতি 

ইসলাম একটি সার্বজনীন ধর্ম ৷ এধর্মের রয়েছে নিজস্ব রীতি-নীতি ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট ৷ যা মানুষকে সভ্যতা শেখায় ৷ বুকে বপন করে মানবতার বীজ ৷ সুস্থ সংস্কৃতির ছোঁয়ায় করে তুলে সত্যিকার মানুষ ৷
 
আপন ধর্মীয় রীতি-নীতি ছেড়ে মানুষ যখন অজ্ঞতাবশত: কিংবা পার্থিব কোন স্বার্থে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণ করে-তখন তা কুসংস্কারে রূপ নেয় ৷ ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করা এজাতীয় ভিন্ন ধর্মীয় রীতি-নীতি, বিজাতীয় সভ্যতা সংস্কৃতি ও নব উদ্ভাবিত বিষয়কে বিদআত বলে অভিহিত করা হয় ৷ যা মুমিনের ঈমানী জীবনকে ভয়াবহ হুমকির মুখোমুখী করে তুলে ৷ তাই নেফাকের মতো সুদর্শন পোশাকাবৃত এই বন্ধুরূপী ঘরের শত্রুকেও প্রতিটি মুমিনের চিনে রাখতে হবে তাহলেই তার ঈমানী জীবন নিরাপদ ও শঙ্কামুক্ত থাকবে ৷

বিদআতের সংজ্ঞা 

আভিধানিক অর্থ: আল্লামা ইবনুল মানযুর আল আন্দালুসী রহ. 'লিসানুল আরব' এ লিখেন:
البدعة: الحدث، والبدع بالكسر:مبتدع بالخير والشر
অর্থাৎ, বিদআত মানে অভিনব বিষয়, নব আবিষ্কৃত বিষয় ভালো হোক বা মন্দ ৷
       --লিসানুল আরব,খ:১ পৃষ্ঠা: ৩৪২
ইমাম নববী রহ. বলেন:
البدعة:  كل شيء عمل علي غير مثال
অর্থাৎ পূর্ব নমুনা ছাড়া কোন বিষয় আবিষ্কার করার নাম বিদআত ৷

পারিভাষিক অর্থ: 
বোখারী শরীফের সুপ্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'উমদাতুল ক্বারী'তে আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহ.লিখেন-
البدعة في الأصل إحداث أمر لم يكن في زمن رسول الله صلي الله عليه وسلم
অর্থাৎ, বিদআত মূলত এমন নব উদ্ভাবিত জিনিস যা রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়াসাল্লামের যুগে ছিল না ৷
            --উমদাতুল ক্বারী, খ:৫, পৃ:৩৫৬

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. তার বিশ্বনন্দিত বোখারী শরীফের ব্যাখ্যগ্রন্থ 'ফতহুল বারীতে' লিখেন-
البدعة أصلها ما أحدث علي غير مثال سبق-وتطلق في الشرع في مقابل السنة-فتكون مذمومة
অর্থাৎ , বিদআত মূলত: এমন জিনিসকে বলা হয়,  যা পূর্ব দৃষ্টান্ত ও নমুনা ছাড়া আবিষ্কার করা হয় ৷ শরীয়তে বেদআত শব্দটি সুন্নতের বিপরীতে ব্যবহৃ হয় ৷ তাই তা নিন্দনীয় !

হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন :
والمراد بالبدعة: ما أحدث مما لا أصل له في الشريعة يدل عليه، وأما ما كان له أصل في الشرع يدل عليه فليس ببدعة شرعا وإن كان بدعة لغة.
অর্থাৎ বিদআত দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ সকল জিনিস যা নতুনভাবে উদ্ভাবন করা হয়েছে ৷ যার সাথে শরীয়তের কোন সম্পর্ক নাই ৷ আর যে জিনিসের মূল ভিত্তি শরীয়তে আছে অভিধানে বিদআত হলেও শরীয়তের দৃষ্টিতে তা বিদআত নয় ৷
   -জামেউল উলূমে ওয়াল হিকাম, পৃ:১৯৭

বিদআতের তাৎপর্য:

সুন্নাতে নববীর খেলাফ সকল কাজই বিদআত ৷ দীনের মধ্যে বিদআতের প্রচলন হলে আসল দীনই বিকৃত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা সৃষ্টি হয় ৷
তাছাড়া দীন হলো আল্লাহর পক্ষ হতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর  উপস্থাপিত স্বচ্ছ, নির্ভুল ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা ৷ সুতরাং এর মধ্যে নতুন কিছু শামিল করার অর্থ হল, আল্লাহ তায়ালা  ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন বুঝতেই পারছিলেন না দীন আসলে কিরূপ হওয়া উচিৎ ছিল ৷ এতদিন পর এই বিদআতিরা তা বুঝতে পেরেছে এবং নিজের বুঝমত নতুন জিনিস আবিষ্কার করে দীনের অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণতা দান করেছে ! (নাউযুবিল্লাহ)
অথচ আল্লাহ তায়ালার সুস্পষ্ট ঘোষণা:

اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَ رَضِیۡتُ لَکُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا ؕ 
আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম ৷
-সূরা আল মায়িদাহ (المآئدة), আয়াত: ৩

বিদআতের অসারতার দিকে ইঙ্গিত করে হযরত হুযাইফাতুবনুল ইয়ামান র.বলেন:
كل عبادة لم يتعبدها أصحاب رسول الله صلي الله عليه وسلم فلا تعبدوها، فإن الأول لم يدع للآخر مقالا، فاتقو الله يا معشر المسلمين، وخذوا طريق من كان قبلكم.    ( الاعتصام1/113)           
অর্থাৎ যে এবাদত সাহাবায়ে কেরাম করেননি, সে এবাদত তোমরা করো না ৷ কেননা, পূর্ববর্তীরা পরবর্তীদের জন্য এমন কিছু রেখে যাননি যা তাদেরকে পূরণ করে নিতে হবে ৷ তাই হে মুসলিম সমাজ! আল্লাহকে ভয় কর ৷ পূর্ববর্তী সাহাবাগণের রীতি-নীতি অনুসরণ করে চল ৷ 

বিদআতের প্রকারভেদ ও পর্যালোচনা:

কতিপয় বিদআতীগণ বিদআতকে তাদের সুবিধার্থে হাসানা সায়্যিয়া নামে দুই ভাগে বিভক্ত করলেও সাহাবায়েকেরাম থেকে নিয়ে উলামায়ে আসলাফের কেউই বিদআতের শ্রেণী বিভক্তি করেননি ৷ 

হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী শায়খ আহমাদ সেরহিন্দী রহ. তেজদ্দীপ্ত কণ্ঠে  সুস্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, বিদআতে হাসানা বলতে কিছু নেই ৷ হাদীসের ভাষায় সব বিদআতই গোমরাহী كل بدعة ضلالة
আর যে আমলের ভিত্তি শরীয়তে রয়েছে সেটা বিদআত নয় ৷ 
এক চিঠিতে মুজাদ্দিদ রহ. লিখেছেন: এই অধম কোন বিদআতেই সৌন্দর্য দেখতে পায় না ৷ শুধু অন্ধকার পঙ্কিলতা ও ত্রুটিই অনুভব করে ৷ যদি আপাতদৃষ্টিতে কোন বিদআতির কাছে কোন বিদআতে কল্যাণ ও সৌন্দর্য দৃষ্টিগোচর হয়ও, কিন্তু আগামীকাল যখন তার হৃদয়শক্তি আরও বলিষ্ঠ হবে  তখন সে অবশ্যয়ই বুঝতে পারবে যে, এর পরিণাম একমাত্র ধ্বংস আর বঞ্চনা ছাড়া কিছু নয় ৷

বিদআত উদ্ভাবনের কারণসমূহ:

কুপ্রবৃত্তির অনুসরণই বিদআতের মূল কারণ ৷ দুনিয়াতে যত ভ্রান্ত মতবাদ আবিষ্কার হয়েছে তার প্রধান কারণ শয়তানের ধোকা ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ ৷
এছাড়াও বিদআত উদ্ভাবনের আরো কিছু কারণ বর্ণনা করেছেন বিশেষজ্ঞ আলেমগণ ৷

যথা:
সম্পদের লোভ, পদমর্যাদা লাভের আশা, অজ্ঞতা, পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ, প্রসিদ্ধি লাভের প্রবণতা, দীনি বিষয়ে নমনীয়তা ও হীনমন্যতা এবং চলমান সময়ে বিদআতের একটি অন্যতম কারণ দেখা যাচ্ছে বিজাতীয় অনুকরণ ও আধুনিকতাপ্রীতি ৷
 
ভারত উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির অনুকরণে নানা ধরনের বিদআত ও কুসংস্কার অনুপ্রবেশ করেছে ৷ বিশেষ করে বিবাহ-শাদীতে যত ধরনের প্রথা পালন করা হয় প্রায় সবই হিন্দু ধর্ম হতে গৃহিত ৷ তেমনিভাবে পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ উপলক্ষে যা করা হয় পুরোটাই হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি ৷

এছাড়াও মুসলিম সমাজে প্রচলিত মারাত্মক কিছু বিদআত হচ্ছে, মৃত ব্যক্তির রূহে সাওয়াব রেসানীর নামে কুলখানী, চেহলাম, মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা ৷ ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন করা ৷ ওরশ করা ৷ 
 মাইকে শবিনা পড়া ইত্যাদি ৷

বিদআতের অশুভ পরিণতি :

ক্ষতির দিক থেকে বিদআত দু'ধরনের ৷

১. বিদআতে মুকাফফারা
অর্থাৎ আকীদাগত বিদআত যাতে লিপ্ত হলে মানুষ ঈমানহারা হয়ে যায় ৷ যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হাযির নাযির ও আলিমুল গাইব মনে করা ৷ কবর পূজা করা ইত্যাদি ৷

২. বিদআতে মুফাসসাকা
অর্থাৎ আমলী বিদআত ৷ যাতে লিপ্ত হলে মানুষ কাফের হয় না তবে ফাসেক হয়ে যায় ৷ যেমন, মিলাদ কিয়াম করা ৷ ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন করা ৷ মুহাররমে মাতম করা ৷ তাযিয়া মিছিল বের করা ইত্যাদি ৷
সারকথা, বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তি ভয়াবহ দুই  ক্ষতির যে কোন একটিতে অবশ্যয়ই পতিত হবে ৷ তাছাড়া দুনিয়া ও আখেরাতের আরো অনেক অকল্যাণ ও মসিবত বিদআতের সাথে সম্পৃক্ত ৷ যা বিভিন্ন হাদিস ও আছার থেকে বুঝা যায় ৷
যথা:
১. বিদআত সুন্নত থেকে বঞ্চিত করে দেয়

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
ما أبدع قوم بدعة إلا رفع الله من سنتهم مثلهاـ لا يعيدها إليهم إلي يوم القيامة
যখন কোন সম্প্রদায় দীনের মধ্যে কোন বিদআত আবিষ্কার করে, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের দীনি জীবন থেকে সমপরিমাণ সুন্নত উঠিয়ে নেন ৷ কিয়ামত প্রর্যন্ত তা আর ফিরিয়ে দেন না ৷
        -সুনানে দারামী, হা,নং ১০১

২. বিদআতির তওবা নসিব হয় না 

মানুষ বিদআত কে নেক কাজ মনে করে সাওয়াবের আশায় তা করে থাকে ৷ এটাকে গুনাহই মনে করে না ৷ তাই তওবা করার তাগিদও অনুভব করে না ৷ ফলে বিদআতী তওবা ছাড়াই মৃত্যুবরণ করে ৷ এবং এটা কুদরতী ব্যাপার ৷ তার এই তাওফীকের দুয়ার বন্ধ হয়ে যায় ৷
إن الله حجب التوبة عن كل صاحب بدعة حتي يدع بدعته( رواه الطبراني في الأوسط)
বিদআতী বিদআত কে পরিত্যাগ করার  পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা তার ও তাওবার মাঝে পর্দা দিয়ে আড়াল করে দেন ৷( তাই সে তাওবার ইচ্ছা ও মানসিকতা থেকেই বঞ্চিত হয়ে যায়)

৩.বিদআতির কোন এবাদত কবুল হয় না

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:
لا يقبل الله لصاحب بدعة صوما ولا صلاة ولا صدقة ولا حجة ولا عمرة ولا جهادا ولا صرفا ولا عدلا، يخرج من الاسلام كما تخرج الشعرة  من العجين
আল্লাহ তায়ালা বিদআতির কোন আমল কবুল করেন না ৷ রোজা, নামাজ, সাদকা, হজ্ব, উমরা, জিহাদ, নফল, ফরজ কোন কিছুই কবুল হয় না ৷ আটার খামিরা হতে চুল যেভাবে বের হয়ে আসে এভাবে বিদআতী ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় ৷
--সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং, ৫২

৪. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে রেসালাতের দায়ীত্ব পালনে ব্যর্থ দাবী করা হয় 

ইমাম মালেক রহ. বলেন:
قال الإمام مالك:  من ابتدع في الإسلام بدعة يراها حسنة فقد زعم أن محمدا صلي الله عليه وسلم خان الرسالة، لأن الله يقول: اليوم أكملت لكم دينكم؛ فما لم يكن يومئذ دينا فلا يكون اليوم دينا ( الاعتصام -1/49)
যে ব্যক্তি ভালো কাজ মনে করে ইসলামে কোন বিদআত উদ্ভাবন করল, স যেন এই ধারণা পোষণ করল যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রিসালাতের দায়ীত্ব পালনে খেয়ানত করেছে ৷(নাউযুবিল্লাহ) যেহেতু আল্লাহ বলে দিয়েছেন - 'আজ আমি তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি ' অতএব সে যুগে যা দীন ছিলনা, আজও তা দীন বলে গণ্য হবে না ৷

৫. বিদআতির পরিণাম জাহান্নাম

হযরত উমর ফারুক ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ র.বলেন-
إنكم ستحدثون ويحدث لكم- فكل محدثة ضلالة، وكل ضلالة في النار ( الاعتصام -65) 
হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমরা অনেক কিছুই নতুন উদ্ভাবন করবে ৷ তোমাদের জন্যও উদ্ভাবন করা হবে দীনের অনেক নতুন কিছু ! জেনে রেখ, সব নব উদ্ভাবিত জিনিসই গুমরাহী ৷ আর সব গুমরাহীর চূঢ়ান্ত পরিণতি জাহান্নাম ৷

৬. বিদআতী সম্মানের অযোগ্য

ইরশাদ হচ্ছে:
عن إبراهيم بن ميسرة رض قال: قال رسو ل الله صلي الله عليه وسلم من وقر صاحب بدعة فقد أعان علي هدم الاسلام.
(رواه البيهقي في شعب الإيمان ) 
হযরত ইবরাহিম ইবনে মায়সারা হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোন বিদআতী কে সম্মান করল, সে মূলত ইসলামকে ধ্বংস করার কাজে সাহায্য করল ৷

৬. বিদআতী হাউযে কাউসারের পানি থেকে বঞ্চিত হবে:

হাশরের ভয়াবহ কঠিন দিনে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাউযে কাউসারের পাড়ে দাড়িয়ে স্বীয় তৃষ্ণার্ত উম্মতকে ডেকে ডেকে পানি পান করাবেন ৷ কিন্তু আফসুস বিদআতীদের সেই সৌভাগ্য নসীব হবে না ৷ 

ইরশাদ হচ্ছে—
عن عائشة رض قالت: سمعت رسول الله صلي الله عليه وسلم يقول: وهو بين ظهراني أصحابه-إني علي الحوض أنتظر من يرد علي منكم فوالله ليقطعن دوني رجال فلأقولن أي رب من أمتي فيقول-إنك لا تدري ما حدثوا بعدك-مازالوا يرجعون علي أعقابهم
( رواه مسلم في صحيحه- رقم -2293)
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা র. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের মাঝে ছিলেন ৷ তখন আমি তাকে বলতে শুনেছি,( হাশরের দিন) আমি হাউযে কাউসারের পাড়ে থাকবো ৷ যাদের আমার কাছে আসার অনুমতি থাকবে তাদের অপেক্ষায় থাকবো ৷ আল্লাহর কসম!  সেদিন একদল লোককে আমার পিছনে পথ আটকে দেয়া হবে (আসার অনুমতি দেয়া হবে না) ৷ আমি ছুটে গিয়ে বলবো, ইয়া রব! এরাতো আমারই উম্মত! তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আপনি জানেন না, আপনি দুনিয়ে থেকে চলে আসার পর এরা আপনার রেখে আসা দীন ও শরীয়তের মধ্যে কতসব বিদআত সৃষ্টি করেছিল এবং এরা যথারীতি আপনার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল ( তাই আপনার হাতে এই পবিত্র সুপেয় পানি পানের অনুমতি নেই তাদের, উষ্ঠাগত তৃষ্ণাই আজ তাদের পুরস্কার) 
          -সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২৯৪

৭. অপরাপর গুনাহ থেকে বিদআত পালনে শয়তান বেশী খুশি হয় 

সুন্নাতের উপর আমল করলে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশি হন ৷ আর বিদআত পালনে খুশি হয় শয়তান ৷ বিদআত শযতানের অস্ত্র ৷ এই অস্ত্র দ্বারা শয়তান পয়গম্বরগণের উপর প্রতিশোধ নিয়ে থাকে ৷ তার প্ররোচনায় নবীর উম্মত যখন বিদআতে লিপ্ত হয়, তখন সে মানসিক তৃপ্তি বোধ করে, এবং নবীর কবরের কাছে গিয়ে ডেকে বলে, হে পযগম্বর ! দেখুন, আপনার উম্মতকে গুমরাহ বানিয়ে আপনার উপর কেমন প্রতিশোধ নিলাম ৷ (নাউযুবিল্লাহ)

বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত সুফিয়ান সাওরী রহ, বলেন --
إن البدعة أحب إلي إبليس من المعصية فإن المعصية يتاب منها. والبدعة لا يتاب منها
(أخرجه السيوطي في الأمر بالإتباع-ص--19)
অর্থ: ইবলিসের নিকট নাফরমানির চেয়ে বিদআত বেশি প্রিয়  ৷ নাফরমানি থেকে তওবা করার সম্ভাবনা থাকে ৷ কিন্ত বিদআত থেকে তাওবা করার সম্ভাবনা থাকে না ৷ আর এতেই শয়তানের স্বার্থকরতা ৷

সারকথা: বিদআত একটি জঘন্য ঈমান ও সুন্নাহ বিধ্বংসী কাজ ৷ বিদআত মানেই গুমরাহী ও অন্ধকার ৷ যার পরিণাম জাহান্নাম ৷ কিন্তু অনেকে বিষয়টি তুচ্ছ মনে করে ৷ এটাও শয়তানের মস্ত বড় ধোঁকা ৷

সাহাবায়ে কেরাম তাবেঈন, তাবে তাবেঈন , আইম্মায়ে দীন, ফুকাহা, মুজতাহিদীন তথা হক্কানী উলামায়ে কেরাম কেউ কোন যুগে বিদআত কে প্রশ্রয় দেননি ৷ আমাদের সকলেরই কর্তব্য সবরকম বিদআত থেকে বেঁচে থাকা ৷ বিদআতীদের সংশ্রব থেকে দূরে থাকা ৷ বিদআতের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা ৷ 

আলেমদের ভূমিকা:

কুফর শিরক ও বিদআত নির্মূল করে সমাজে বিশুদ্ধ তাওহীদ ও রেসালাতের বীজ বপণ করাই কুরআন ও হাদিসের মৌলিক কর্মসূচী ৷ আলোচিত সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনার মাধ্যমে বিষয়টি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে আশা করি ৷ 
তাই রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন, আইম্যায়ে দীন, মুজতাহিদীন সকলেই এক্ষেত্রে বজ্রকঠিন ভূমিকা পালন করেছেন ৷ আপসহীন মানসিকতা নিয়ে কুফর শিরকের সব ব্যাধির চিকিৎসা করেছেন ৷ সকল আঁধারে আলো জ্বেলেছেন ৷ ঈমানের চাষাবাদ করেছেন ৷ কৌশলে, উপদেশে, দূরদর্শী বর্ণিল কার্যক্রমে সমাজকে ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে গিয়েছেন ৷ 

খোলাফায়ে রাশেদার পর থেকে দেওবন্দ আন্দোলন নাগাদ হাজার হাজার মনিষী এই মহান দায়ীত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন ৷ কর্মপদ্ধতি ভিন্ন ছিল ৷ কিন্তু সবাই মৌলিকভাবে সমাজ কে কুফর শিরক মুক্ত করার অনবদ্য লক্ষ্যে অভিন্ন ছিলেন ৷ সূদীর্ঘ এই মহান কাফেলার মধ্যে তিন মহান সাধকের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য ৷  ইমাম গাযালী রহ.(৪৫০-৫০৫ হিজরী),
মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহ,(৯৭১-১০৩৪ হিজরী), শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ.(১১৩৪-১১৭৬ হিজরী) ৷ 

ইমাম গাযালি রহ. মহাসমারোহে তার ইলমী ও কর্মময় জীবন শুরু করেছিলেন জীবনের ঊষালগ্নেই  ৷ গবেষণা ও অনুসন্ধানের পর আত্মার সমৃদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জনের জন্য আবারো চলে যান একাকী এবাদত ও আত্মগঠনের আলোকিত ভূবনে ৷ পৃথিবীর সব অর্জন ও প্রাপ্তিকে পায়ে দলে সূদীর্ঘ এগারো বৎসর যিয়াযত মুজাহাদা ও সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন ৷ আবার ফিরে আসেন লোকালয়ে ৷ জ্ঞান বিজ্ঞান দর্শণ ও গবেষণার রাজকীয় জীবনে ৷ এবং সমাজের কুফর শিরক ও সব অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন৷ সূদীর্ঘ সাধনায় অর্জিত নিজের সব  জাহেরী ও বাতেনী উপকরন নিয়ে ৷ কুফরী শিরকী ধ্যান ধারনায় লালিত ও প্রভাবিত সব জ্ঞানের জগৎ কে স্তব্ধ করে দেন ৷ ঈমানী আলোয় উদ্ভাসিত চিন্তার সব পাথেয় সরবরাহ করেন ৷ 
"ইহয়ায়ে উলূমুদ দীন" আলমুনকিয মিনাদ-দলালাহ, মাকাসিদুল ফালাসাফাহ সহ পৃথিবীখ্যাত বহু কালোত্তীর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন ৷ সভ্যতা, দর্শণ, সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগৎ কে বিমোহিত করেন ৷ ঋণী হয় পৃথিবী ও প্রজন্ম ৷ প্রজ্ঞা তাকওয়া ও সাধনার সূর্য দিয়ে এই মহান ইমাম পৃথিবীকে পবিত্র আলোয় অবগাহন করার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যান ৷ মাত্র পঞ্চান্ন বৎসরের ছোট্র জীবনেই সভ্য পৃথিবীর বিলুপ্ত পরিচয় কে উদ্ধার করে অবিনশ্বর শুদ্ধ চিন্তায় উদ্ভাসিত করে যান ৷

হযরত আহমাদ সারহিন্দ রহ .৷ যাকে পৃথিবী মুজাদ্দিদে আলফে ছানী নামে চিনে ৷ ইতিহাসের এক উজ্জল বাতিঘর ৷ সৃজনশীল সংস্কারচিন্তার এক সুউচ্চ মিনার ৷ হৈঁ চৈঁ নয় ৷ চুপচাপ শুধু কাজ করতে হবে ৷ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে ৷ পরিকল্পিত  কর্মপন্থা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে ৷ কুফর ও শিরকের বাজার গরম করেছিল আকবরের দীনে এলাহী ৷ দুনিয়া পূজারী ওলামায়ে সূদের নিরবতা ও সহযোগীতা এই অন্ধকার কে আরো শক্তিশালী করছিল ৷ অন্যান্য আরো বাতিল ফিরকার নানান তৎপরতাও চলমান ছিল ৷ এই বহুমুখী প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে তিনি তার নিরব ও পরিকল্পিত মিশন নিয়ে এগিয়ে যান ৷ একসময় সরব পৃথিবীর গরল গল্প বিভ্রান্ত নেতাদের মনে আঁঘাত করতে থাকে ৷ রাজার সভাসদ থেকে নিয়ে ছোট বড় সবার মধ্যেই মুজাদ্দিদ রহ. এর ইখলাসভরা হিকমতপূর্ণ কথা, নসিহত ও সংস্কারমূলক চিঠি-পত্র গভীরভাবে রেখাপাত করে ৷ বহু কুফর শিরকের কবর রচনা হয় ৷ সেখানে ঈমানের মশাল জ্বলে উঠে ৷ আকবরের দীনে এলাহী ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয় ৷ 

শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. ৷ ভারত উপমহাদেশে কুরআন ও হাদিস চর্চার পথিকৃত ৷ প্রাণপুরুষ ৷ তার রাজদ্বার হয়েই কুরআন হাদিসের সব সনদ তথা ঐতিহাসিক দালিলীক ভিত্তি নিশ্চিদ্র সত্য বাস্তবতার পোশাক পড়ে ৷ পৌঁছে যায় সব ইলম পিপাসুদের ঘরে ঘরে ৷ প্রখ্যাত- বিখ্যাত সব মুফাস্সির ও মুহাদ্দিস তাঁর কাছে ঋণী ৷ ইলমের সব মাজালিস তার দানে ধনী ৷ তিনি তাঁর কলম ও যবান দিয়ে নিরন্তর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন সব কুফর, শিরক ও ফেতনার বিরুদ্ধে ৷ লাগাতার লিখেছেন তাফসীর,হাদিস রিজাল,ফিকাহ ও আকিদা বিষয়ক মৌলিক সব গ্রন্থ ৷ সুখপাঠ্য সুসংহত বর্ণনায় ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সকল যৌক্তিক, প্রায়োগিক ও কল্যাণমুখী দিকের স্বার্থক চিত্রায়ণ করেছেন তার যুগান্তকারী গ্রন্থ "হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা" তে ৷ 
যেখানে হাদিসে নববী ও সুন্নার আলো থাকে, সেখানে বিদআতের আঁধার থাকতে পারে না ৷ যেখানে উলূমে কুরআন ও তাওহীদের জ্যোতি থাকে, সেখানে কুফর শিরকের ময়লা থাকতে পারে না ৷ এই চেতণা ও দর্শণ কে লালন করেই তিনি কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূদৃঢ় বলয় তৈরী করেছিলেন ৷ সর্বত্র সে মজবুত রজ্জু ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ৷ এভাবেই সে সময়ে দেশজুড়ে বিশুদ্ধ তাওহিদ ও সুরভিত সুন্নার চাষাবাদ করেছিলেন ৷ যার ফল-ফুল আজো সবাইকে পরিতৃপ্ত করছে,অনাগত সময়েও করে যাবে ৷

তারপর কিছুদিন পরেই দারুল উলুম দেওবন্দের যাত্রা শুরু হয় ৷ যার স্বপ্ন, জন্ম, বেড়ে উঠা, প্রতিষ্ঠা, সবই নিবেদিত শুধু খালেস তাওহিদ ও রেসালাত এবং কুরআন ও সুন্নার আলোকিত সমাজ গড়ে তোলার জন্য ৷ ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকেই পরম সুখের স্বর্গীয় পরিবেশ উপহার দেয়ার জন্য ৷
কুফর শিরকের সাম্রাজ্য কম্পিত হয় এই বিশুদ্ধ ঈমানী কাফেলার আভির্ভাবে ৷ 
আল্লামা কাসেম নানুতুবী রহ.থেকে শুরু করে রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী, হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী, আশরাফ আলী থানভী, জাফর আহমাদ উসমানী, শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী, হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. প্রমূখ মহা মনীষীদের পথ ধরে এপারেও গড়ে উঠে ক্বারী ইবরাহিম, মাওলানা হাবীবুল্লাহ,ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম, আল্লামা শামসুল হক ফরীদপুরী,মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী, মাওলানা আতাহার আলী, মুফতি আজম ফয়জুল্লাহ রহ.সহ বহু যুগশ্রেষ্ট আলেমে দীন ৷ যাদের নিরন্তর সাধনা, বহুমুখী বলিষ্ঠ চেতণা, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক দীনি পদচারণা বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলকেই কুফর শিরকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে যথেষ্ট ভুমিকা রেখেছে ৷ বেদআত ও কুসংস্কারের বহু মজমা সুন্নার আলোকিত মাহফিলে রূপান্তরিত হয়েছে ৷

তাদের রূহানী সন্তানগণ আজও ঈমানের শ্বাশত আলোয় সমাজকে প্রদীপ্ত করার লক্ষ্যে থানা, জেলা, শহর-নগর ও দূর দূরান্তের পল্লী-গ্রামে দিনরাত মেহনত করে যাচ্ছে ৷ যার ফলশ্রুতিতে দেশী বিদেশী ভয়াবহ নানান ষড়যন্ত্র এবং আগাছার মত গজিয়ে উঠা নামী বেনামী অসংখ্যা বাতিল ফেরকার অশুভ তৎপরতা সত্ত্বেও বিশুদ্ধ তাওহিদ ও রিসালাত এবং কুরআন ও সুন্নার সূর্য এখনও দেশবাসীকে আলো দিয়ে যাচ্ছে ৷ অনাগত সময়েও দিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ ৷

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জানাযার সালাম প্রসঙ্গ

  জানাযায় এক সালাম না দুই সালাম, একটি দালীলিক পর্যালোচনা হানাফী এবং শাফী মাযহাবের গবেষণায় জানাযার নামাজে দুই দিকে সালাম ফেরাতে হবে ৷ আর মালেকি মাযহাব মতে জানাযার নামাজে এক দিকে সালাম ফেরাতে হবে ৷ অপরদিকে হাম্বলি মাযহাবে জানাযায় এক সালাম ফেরানোটা নামাযের রুকোন ( গুরূত্বপূর্ণ কাজ) ৷ তবে যদি দ্বিতীয় সালাম ফিরিয়েও নেয় সমস্যা নেই, নামাজ হয়ে যাবে ৷ এমনিভাবে ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালেক রহ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এই তিন ইমামের নিকটই সালাম জানাযার নামাজের রুকোন ৷ কিন্তু ইমাম আবু হানিফা রহ, এর  নিকট সালাম জানাযার রুকোন নয় বরং ওয়াজিব ৷ হানাফী মাযহাবের কুরআন-হাদীস ও যৌক্তিক উভয় প্রকারের শক্তিশালি দলীল রয়েছে ৷ (1)ইবরাহিম হাজারী থেকে বর্ণিত যে, একবার আব্দুল্লাহ ইবনে আবু আওফা র. নিজের কন্যার জানাযার নামাজ পড়াচ্ছিলেন, তখন তিনি চার তাকবীর বলেন ৷ তারপর অনেকক্ষণ থেমে যান, এমনকি আমরা ভাবছিলাম, তিনি হয়ত পঞ্চম তাকবীর বলবেন ৷ কিন্তু তারপর তিনি ডান দিকে সালাম ফেরান, অতপর বাম দিকে সালাম ফেরান এবং বলেন এভাবেই রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামাজ পড়াতেন ৷ -বায়হাকীকৃত সুনানে কুবরা (4/71...

vaskorjo o murti haram